হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভাষা- আন্দোলন

আরিফুল ইসলাম ভূঁইয়া

১৯৪৭ সালে ভাষা আন্দোলনের সূচনা পর্ব থেকেই নরসিংদী তথা হাতিরদিয়ায় বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম শুরু হয়। রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন শুরুর পেছনে নরসিংদীর কৃতি সন্তানদের ভুমিকা ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র

প্রতিষ্ঠিত হল। পাকিস্তান সৃষ্টির পর শাসক চক্র পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মুখের ভাষা বাংলাকে বাদ দিয়ে সর্বত্র উর্দূ ভাষা চালুর ষড়যন্ত্র শুরু করে। সদ্য স্বাধীন হওয়া রাষ্ট্র পরিচালনা, কাঠামো ও ভাষাসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার জন্য মে মাসের শেষ

সপ্তাহে ঢাকায় রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, বুদ্ধিজীবী, ছাত্রনেতা, সাংবাদিক ও শিক্ষাবিদদের এক সভা অনুষ্ঠিত হয় নরসিংদী জেলার বিশিষ্ট সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ রাজিউদ্দিন ভূঞার ( হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ছাদত

আলী ভূঞার ভাতিজা) দোতলা বাড়ির বিরাট হল রুমে। সেখানে অন্যান্য বিষয়ের সাথে ভাষার প্রশ্নটিও আলোচিত হয়। উক্ত বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যাপারে নরসিংদীর কৃতি সন্তান রাজিউদ্দিন ভূঞা (বংগীয় ব্যাবস্থাপক পরিষদ সদস্য ১৯৪৬, পূর্ব পাকিস্থান

প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য ১৯৬২ ও হাতিরদিয়া রাজিউদ্দিন ডিগ্রী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা) ও তার শ্রী ডা. জোহরা বেগম কাজির ভূমিকা ছিল অনবদ্য। এ সময়টাতে রাজিউদ্দিন ভূঞা হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়সহ অত্র এলাকাজুড়ে বাংলাকে

রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সাংগঠনিক কাজ দেখভাল করেন।
১৯৪৭ সালের পহেলা সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের তৎকালীন অদ্যাপক আবুল কাশেমের উদ্যোগে ঢাকার ১৯ নং আজিমপুরে গঠিত হয় ভাষা-আন্দোলনের স্থপতি সংগঠন ‘ তমদ্দুন মজলিস ‘।

তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগে এই সময় নরসিংদীতে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। তমদ্দুন মজলিসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, ভাষা সংগ্রামী ও মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ফজলুর রহমান ভূঞা নরসিংদীতে ভাষা-আন্দোলন সংগঠনে বিশেষ অবদান রাখেন। জনাব

ফজলুর রহমানের জন্মস্থান নরসিংদী জেলার মনোহরদী উপজেলার অন্তর্গত লেবুতলা ইউনিয়নের তারাকান্দি গ্রামে। ভাষা-আন্দলনের সেই সূচনা পর্ব থেকেই আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য নরসিংদীতে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করতেন এবং তারই উদ্যোগে নরসিংদী

জেলার বিভিন্ন স্থানে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ ও তমদ্দুন মজলিসের শাখা গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের দিকে বাংলাকে যখন অনেকেই পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে দ্বিধান্বিত ছিলেন তখন থেকে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রচেষ্টায় তিনি

নরসিংদী, মনোহরদী, হাতিরদিয়া এবং ঢাকায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেন। এডভোকেট ফজলুর রহমান ভূঞা ১৯৪৮ সালের প্রথম দিকে হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শন করেন এবং ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে ছাত্র-শিক্ষকদের সাথে

আলোচনা সাপেক্ষে তাদেরকে এই সংগ্রামে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হন। নরসিংদীর আরেক কৃতি সন্তান আজকের আন্তর্জাতিক ক্ষ্যাতি সম্পন্ন মরমি কবি, ইসলামী ভাবধারার সাহিত্যিক সাবির আহমেদ চৌধুরী ছিলেন ১৯৪৭-৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনের অন্যতম সাহসী সৈনিক। তার বাড়ি নরসিংদীর বেলাবো

উপজেলার হাড়িসাংগান গ্রামে। তিনি হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের(১৯৪৫) ছাত্র ছিলেন। তিনি অত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনে শরিক হতে উদ্ভুদ্ব করেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারী ঢাকায় আন্দোলনরত ছাত্র হত্যার পর এই

স্কুলের ছাত্ররা প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠে। তারা পাকিস্তানের একপেশে নীতির বিরুদ্ধে এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সোচ্চার হয়। ক্লাস বর্জন করে মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ নেয়।
১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনে হাতিরদিয়ায় ব্যাপক

তৎপরতা দেখা যায়। ১১ মার্চ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ঢাকা শহর এবং পূর্ব পাকিস্থানের সর্বত্র হরতাল পালিত হয়। এটি ছিল পাকিস্তান আমলে প্রথম হরতাল কর্মসূচি। এইদিন নরসিংদীতে শান্তিপূর্ণ ভাবে হরতাল কর্মসুচি পালিত হয়। ভাষা-আন্দোলন ভালভাবে

রাজনৈতিক রুপ পরিগ্রহ করার পূর্ব পর্যন্ত উপদলীয় নেতারা পূর্ব পাকিসস্তানের বিভিন্ন স্থানে ছাত্র ও অন্যান্য কর্মীদের সাথে যোগাযোগের জন্য মাঝে মাঝে সফর করতেন। সেই উদ্দেশ্যে নরসিংদীতে একটি কৃষক সভার আয়োজন করা হয়। এই সভায় মোহাম্মদ আলীর

সভাপতিত্ব করার কথা ছিল। ড. মালেক, তফাজ্জল আলী, কামরুদ্দীন আহমদ প্রমুখ কয়েকজনের বক্তৃতা দানের কথা ছিল। নির্ধারিত দিনে সকাল ১০ টায় ট্রেন ছাড়ার কিছু পূর্বে মোহাম্মদ আলী নরসিংদীতে না যাবার সিদ্ধান্ত জানিয়ে কামরুদ্দিন আহমদকে খবর

দেন। এর কারন ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর কাছে এই মর্মে অভিযোগ করা হয়েছে যে, সভায় গমনকারীরা জমিদারী প্রথাকে রাষ্টদ্রোহী বিবেচনা করায় তার পক্ষে কৃষক সভাটিতে যোগদান করা সম্ভব নয়। উল্লেখ্য, সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে

জমিদারী প্রথা চালু ছিল। মোহাম্মদ আলীর সিদ্ধান্ত জানার পরও কামরুদ্দীন আহমদ নরসিংদী যাবার কর্মসূচী পরিবর্তন না করে পূর্ব কথামত সেখানে যান এবং যথারীতি বক্তৃতা করেন। উক্ত কৃষক সভায় হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র

শিক্ষকরাও যোগদান করেছিল। ১৯৫২ সালের ভাষা-আন্দোলনে হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভূমিকা ছিল উল্লেখ করার মতো। ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় পুলিশের গুলিতে ছাত্রদের মৃত্যুর খবর নরসিংদীতে পৌঁছলে নরসিংদীবাসী গর্জে উঠে।

এর প্রতিবাদে স্কুলের ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে মিছিল করেছেন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে। তখন এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন বীর আহাম্মদপুর গ্রামের কারার আবদুস শহীদ, চর মনোহরদী গ্রামের নুরুল ইসলাম মোল্লা, সৈয়দেরগাঁও গ্রামের আশরাফ হোসেন খান (মতি),

রিয়াজ উদ্দিন মোল্লা, কোচেরচর গ্রামের এনামুল হক। এরা সহ অন্যান্য অনেক ছাত্র সেই মিছিলে অংশগ্রহন করে। সেই সময়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র কারার আব্দুস শহীদ ও নুরুল ইসলাম মোল্লার ভাষ্য মতে,” ২১ ফেব্রুয়ারি হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে নরসিংদীতে

হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্ররাই প্রথম ক্লাশ বর্জন করে প্রতিবাদ মিছিল বের করেছিল এবং কালো ব্যাজ ধারন করেছিল। রাষ্টভাষা উর্দূ ঘোষনার বিরুদ্ধে এবং ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে স্কুলের সকল ছাত্র ক্লাস বর্জন ও প্রতিবাদ সমাবেশে অংশ

নিয়েছিল। স্কুলের কোন শিক্ষকগণ এ উদ্দেশ্যে ছাত্রদের মিটিং মিছিল করতে কোন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেননি। আমাদের শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক আব্দুল হক স্যার যার কোন সভা, মিছিল,আন্দোলনে ইতিপূর্বে সহযোগীতা প্রদর্শন করার নজির না থাকলেও ছাত্র

হত্যার ব্যাপারে এবার তিনি নিজ থেকেই এগিয়ে এসেছিলেন।” হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় (১৯৪৬) ব্যাচের ছাত্র সৈয়দপুর গ্রামের ডা. হাবিবুর রহমান এই স্কুল থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। তিনি ঢাকা মেডিকেল

কলেজে ছাত্রাবস্থায় ভাষা-আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত হন। ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ব্যারাক প্রাংগনে নির্মিত শহীদ মিনার তৈরিতে অংশগ্রহণ ও পুলিশের লাঠিচার্জে আহত হওয়াসহ আন্দোলনের নানা পর্যায়ে তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

উপমহাদেশের প্রথম মুসলিম নারী চিকিৎসক অধ্যাপিকা ডা. জোহরা বেগম কাজি তৎকালীন সময়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের আবাসিক চিকিৎসক ছিলেন। একুশের ছাত্র হত্যাকান্ডের পর তিনি রাস্তায় নেমে আসেন এবং আন্দোলনের সাথে একাত্বতা ঘোষনা

করেন। তিনি পিন্সিপালকে হত্যাকান্ডস্থল ঘুরে দেখান এবং ক্ষোপ প্রকাশ করেন। পরবর্তি ২২ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনেও অংশ নেন। ঢাকায় নিহতের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের জন্য ২৮ ফেব্রুয়ারি মনোহরদী উপজেলার হাতিরদিয়া বাজারে এক জনসভা

হয়। সভায় প্রায় ১৫ হাজার লোক উপস্থিত ছিল। এতে সভাপতিত্ব করেন ডা. মুজাফ্ফর হোসেন। এদিন হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়সহ পুরো এলাকায় হরতাল পালিত হয়েছিল। সভায় ছাত্রদের উপর গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানানো হয়। ৪ মার্চ

১৯৫২ তারিখে এই ঐতিহাসিক জনসভাটির খবর তৎকালীন দৈনিক আজাদ পত্রিকায় গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়। ২৮ ফেব্রুয়ারির এই জনসভায় হাতিরদিয়া স্কুলের ছাত্ররা মিছিলসহ অংশ নিয়েছিল এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবীর আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার স্থাপিত হয় ১৯৯৯ সালে। এর পূর্বে অস্থায়ীভাবে নির্মিত শহীদ মিনারে পুষ্পাঞ্জলি অর্পন করে শহীদ দিবস পালিত হত। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের

ভূমিকা চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। কৃতজ্ঞতাঃ এম আর মাহবুব,পরিচালক, ভাষা-আন্দোলন গবেষণা কেন্দ্র। তথ্যসূত্রঃ১) পূর্ব বাংলার ভাষা-আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি – বদরুদ্দিন উমর। ২) জাতীয় রাজনীতি ; ১৯৪৫ থেকে ১৯৭৫- অলি আহাদ। ৩)
রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের আঞ্চলিক ইতিহাস- আবু মোহাম্মদ দেলোয়ার হোসেন সম্পাদিত, বাংলা একাডেমী। ৪) নরসিংদীতে ভাষা-আন্দোলন- এম আর

মাহবুব। ৫) রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের ইতিহাস- এম. এ. বার্ণিক, এ.এইচ ডেভে। ৬) দৈনিক আজাদ পত্রিকা; ৪ মার্চ ১৯৫২। ৭ সাপ্তাহিক সৈনিক ২৩ মার্চ ১৯৫২। ৮) একান্ত সাক্ষাতকার – এডভোকেট ফজলুর রহমান ভূঞা, সাবির আহমদ চৌধুরী, আব্দুল করিম পাঠান,

মোঃ নবীউল হক শিকদার, কারার আব্দুস শহীদ, ড. জোহরা বেগম কাজী, নুরুল ইসলাম মোল্লা প্রমুখ। প্রথম প্রকাশঃ ডিসেম্বর ২০১৫ প্রকাশকঃ’নহর’ (ম্যাগাজিন) ৭৫ বছর পুর্তি উদযাপন পরিষদ, হাতিরদিয়া ছাদত আলী আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়।

এই ধরনের আরো খবর